বাংলাদেশ সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সন্তান প্রসবের সময় পরিবারের নরমাল ডেলিভারির দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। নরমাল ডেলিভারি অবশ্যই সিজারিয়ান সেকশন থেকে উত্তম।
কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার সিজারিয়ান সেকশন করতে পরামর্শ দেওয়ার পরও পরিবারের লোকজন নরমাল ডেলিভারির জন্য সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে থাকে। যার কারণে অনেক সময় সন্তান প্রসবের আগেই মারা যায়, সন্তান জন্মদানকারী মা পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগেন। এমনকি প্রসবকাল দীর্ঘায়িত করলে মায়ের মৃত্যুও হতে পারে।
প্রসবকালীন ব্যথা শুরুর সময়কাল থেকে সন্তান বার্থ ক্যানাল দিয়ে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার সময়কাল যদি ১৮ ঘণ্টার বেশি হয় সেটাকে আমরা "প্রোলংড লেবার" বলে থাকি।
প্রোলংড লেবার এর বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন -
১. অপর্যাপ্ত জরায়ু সংকোচন
২. সন্তান প্রসবের পথে কোনো বাধা( পেলভিক টিউমার, পরিপূর্ণ মূত্রথলি ইত্যাদি)
৩. জরায়ুতে সন্তানের অ্যাবনর্মাল পজিশন
তবে এইসব ক্ষেত্রে সচরাচর চিকিৎসক শুরুতেই সিজারিয়ান সেকশন সাজেস্ট করেন না, বরং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু সমস্যাটা হয়, যখন পর্যাপ্ত জরায়ু সংকোচন, প্রসবপথে কোনো প্রকার বাধা না থাকা, সন্তান জরায়ুতে সঠিক পজিশনে থাকা সত্ত্বেও প্রসবকাল দীর্ঘায়িত হয়। এই জাতীয় সমস্যাকে বলে "অবস্ট্রাক্টেড লেবার"।
অবস্ট্রাকটেড লেবার এর ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সিজারিয়ান সেকশন এর পরামর্শ দেন কারণ এক্ষেত্রে নরমাল ডেলিভারি এর অপেক্ষা করতে গেলে সন্তান এবং মা উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
অবস্ট্রাক্টেড লেবার এ মা এবং সন্তান উভয়ের উপর কিছু বাজে প্রভাব পড়ে।
মায়ের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখি -
১. দীর্ঘ সময় ধরে অত্যধিক ব্যথা এবং দুশ্চিন্তার কারণে ক্লান্তি চলে আসে
২. পেশির অতিরিক্ত সংকোচন এর কারণে এবং সে অনুসারে ফ্লুইড রিপ্লেস করতে না পারায় ডিহাইড্রেশন দেখা যায়
৩. সন্তান প্রসবকালীন সময়ে রক্তক্ষরণ এর কারণে শক দেখা দিতে পারে
যা মায়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
সন্তানের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখি -
১.অত্যধিক জরায়ু সংকোচনের কারণে রক্তপ্রবাহে সমস্যা হয়, এবং অক্সিজেন এর অভাব দেখা দেয়
২. অক্সিজেন এর অভাবজনিত কারণ থেকে এসিড ক্ষার ভারসাম্যে তারতম্য হয়
৩. মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে
সন্তান এসব কারণে দীর্ঘসময় ব্যবস্থা না নিলে মৃতাবস্থায় জন্ম নিতে পারে।
এইসব সমস্যা ম্যানেজমেন্ট এ প্রাথমিকভাবে আমাদের তিনটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয় -
১. অবস্ট্রাকশন এর কারণ সমাধান
২. ডিহাইড্রেশন এবং কিটোএসিডোসিস প্রতিরোধ
- রিংগার্স সলিউশন দিয়ে ফ্লুইড ব্যালান্স মেইনটেইন করা হয়
৩. ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ
- ভ্যাজাইনাল সোয়াব নিয়ে ইনফেকশন শনাক্ত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী আইভি অথবা ওরাল ঔষধ দেওয়া হয়
এসব এর পর জরায়ুতে কোনো রাপচার না থাকা সাপেক্ষে প্রসবের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ব্লাড গ্রুপিং করে, প্রয়োজনে ব্লাড দেওয়ার ব্যবস্থা রেখে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এসব ক্ষেত্রে নরমাল ডেলিভারি করা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত সন্তান জন্ম নেয়। নরমাল ডেলিভারি এক্ষেত্রে উচিত নয়। সিজারিয়ান সেকশন এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উপায়। অবস্ট্রাক্টেড লেবার যদি শুরুতেই শনাক্ত করা যায় এবং সে অনুযায়ী সন্তান এর কোনো সমস্যা হওয়ার আগেই যদি সিজারিয়ান সেকশন করা যায়, মা এবং সন্তান উভয়কেই বাঁচানো সম্ভব।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ যদি সিজারিয়ান সেকশনের দিকে হয়, তাহলে কখনোই মা এবং জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে নরমাল ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।