সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি

 ২০০২ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ ১০০ জন "ব্রিটন অনুসন্ধানের" জরিপ শেষ হওয়ার পরপরই, বিবিসি হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ব্যক্তিত্বকে খুঁজে বের করতে একই ধরনের জরিপের আয়োজন করেছিল। ২০০৪ সালে, বিবিসির বাংলা পরিসেবা মাধ্যম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শিরোনাম নিয়ে ১১ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপটিতে বাংলাদেশ, ভারত (পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম রাজ্য) সহ বিশ্বব্যাপী অবস্থানরত বাঙালিরা অংশ নেয়।

এই জরিপ সম্পর্কে বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা বলেন-

এখানে আমরা নিজেদের কোন মনগড়া তালিকা তৈরি করছি না। এখানে শ্রোতারা স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন, এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে, কোন রকম মারপ্যাঁচ ছাড়াই ২০জন সেরা বাঙালির তালিকা তৈরি করা হবে। স্বপ্রণোদিত অংশগ্রহণের ভিত্তিতে করা জরিপ 'বিজ্ঞানসম্মত' নাও হতে পারে। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এই তালিকা যে নিরপেক্ষ, তা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না।

ঐ জরিপের মনোনয়নে মোট ১৪০জনের নাম আসে। বিবিসি ২৬শে মার্চ থেকে শীর্ষ ২০জনের নাম ঘোষণা করতে শুরু করে যেখানে প্রতিদিন ২০জনের মধ্য থেকে একটি নাম ঘোষণা করা হতো। ১৪ই এপ্রিল চূড়ান্ত দিনে, যা পহেলা বৈশাখের (বাংলা নববর্ষ) দিন ছিল, বিশ্বব্যাপী অবস্থানরত বাঙালিদের ভোটদানের ভিত্তিতে বিবিসি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে ঘোষণা করে।

ভোটদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বিবিসি'র বাংলা পরিষেবা মাধ্যমটি বলে যে কোন ধরনের ত্রুটি বা বিতর্ক এড়াতে তারা সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতির ভোট ব্যবস্থার অনুসরণ করেছিল। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি খুঁজে পেতে একের পরিবর্তে পাঁচটি পছন্দ মনোনয়ন করতে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিটি ভোটারের শীর্ষ মনোনীত প্রার্থীকে পাঁচ পয়েন্ট, দ্বিতীয় মনোনীত প্রার্থীকে চার পয়েন্ট, এভাবে সর্বশেষ পঞ্চম মনোনীত প্রার্থীকে এক পয়েন্ট দেওয়া হয়েছিল। মোট পয়েন্টের ভিত্তিতে, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছিল।

বিবিসি জানায় যে শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় স্থানঅধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পয়েন্ট পেয়েছেন, যেখানে ঠাকুর নিজেই কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে দ্বিগুণ পয়েন্ট পেয়েছেন এবং নজরুল এ কে ফজলুল হকের চেয়ে দ্বিগুণ পয়েন্ট পেয়েছেন। বাকি ১৭জন ব্যক্তিদের মধ্যে পয়েন্টের খুব একটা পার্থক্য ছিল না। সর্বোচ্চ ছয়জন রাজনীতিবিদের সাথে তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন লেখক ও সমাজ সংস্কারক। চূড়ান্ত তালিকায় দুজন ধর্ম প্রচারক, একজন বিজ্ঞানী ও একজন অর্থনীতিবিদও রয়েছেন। বেগম রোকেয়া ছিলেন একমাত্র নারী এবং অমর্ত্য সেন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি শীর্ষ ২০-এ স্থান পেয়েছেন।

১. শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু)

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বিশ্বকবি)

৩. কাজী নজরুল ইসলাম (বিদ্রোহী কবি/বাংলাদেশের জাতীয় কবি)

৪. এ.কে ফজলুল হক (শের-ই-বাংলা)

৫. সুভাষ চন্দ্র বসু (নেতাজি)

৬. রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন (সমাজ সংস্কার)

৭. জগদীশ চন্দ্র বসু (আচার্য/ বিজ্ঞানী)

৮. ঈশ্বরচন্দ্র (বিদ্যাসাগর/ সমাজ সংস্কারক)

৯. আবদুল হামিদ খান ভাসানী (মজলুম জননেতা)

১০. রাজা রামমোহন রায় (সমাজ সংস্কারক)

১১. সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর/ বিপ্লবী)

১২. লালন শাহ (দার্শনিক)

১৩. সত্যজিৎ রায় (চলচ্চিত্রকার)

১৪. অমর্ত্য সেন (অর্থনীতিবিদ)

১৫. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদ

১৬. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (ভাষাবিদ)

১৭. স্বামী বিবেকানন্দ (ধর্ম প্রচারক)

১৮. অতীশ দীপঙ্কর (ধর্ম প্রচারক/ দার্শনিক)

১৯. জিয়াউর রহমান (সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা/ বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি)

২০. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (রাজনীতিবিদ)

বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা জানান-

কয়েক দিন পরে বিবিসির হিন্দি বিভাগের একজন সিনিয়ার সহকর্মী আমাকে বললেন, রবীন্দ্রনাথ প্রথম স্থানে না আসায় তিনি অবাক হয়েছেন। আমি জবাবে বললাম, ৩০ বছর আগে এই জরিপ হলে রবীন্দ্রনাথ নি:সন্দেহে শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনোনীত হতেন। কিন্তু এই ৩০ বছরে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেছে - বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের আবির্ভাব হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিব। এই জরিপের ফলাফল সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

[তথ্যসমূহ বিবিসি বাংলা এবং উইকিপিডিয়া থেকে গৃহীত]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন