আমার মায়ের কোন ব্যাংক একাউনট ছিল না। তোষকের নিচে টাকা রাখতেন। ওটাই ব্যাংক। কোন তালা ছিল না। পাহারাদার নেই। তারপরও সবকিছু ঠিকঠাক। কেউ চুরি করতো না। ভাইবোন না। কাজের লোকও না। বাদামওয়ালা,ঝালমুড়িওয়ালা,আইসক্রিমওয়ালা এলে আমরা ছুটে যেতাম মার কাছে- আম্মা টাকা দেন। আম্মার মন ভাল থাকলে তোষকটা তুলতেন। মন খারাপ হলে তুলতেন না। তোষক তোলার স্পর্ধা ছিল না আমাদের। আম্মা যেদিন তোষক তুলতেন না - আমরা এতিমের মত চেয়ে থাকতাম তোষকটার দিকে। খুব রাগ হতো। ইচ্ছে হতো তোষকটা জ্বালিয়ে দিতে কিন্তু মার রক্তচক্ষুর কাছে, আমরা এতিম। শব্দহীন। শক্তিহীন।
তারপর আস্তে আস্তে বড় হলাম। লেখাপড়া শেষ করলাম । রোজগার শুরু হলো। মা তখনও তোষকের নিচে টাকা রাখেন । একদিন লন্ডন থেকে বাড়ি ফিরলাম। আম্মাকে বললাম- বাজারে যাবো। কী কী লাগবে ? আম্মা লম্বা ফর্দ লিখলেন। তিনি জানেন আমার পকেটে অনেক টাকা। তাকে আর তোষক তুলতে হবে না। আমি লম্বা ফর্দ নিয়ে বাজারে যাবো, অমনি আম্মা আমাকে থামালেন। তোষকটা তুললেন। ময়লা একটা ১০ টাকার নোট বের করলেন। আমি অবাক। তিনি কি আইক্রিমের পয়সা দিবেন ? আমি বালক ? আম্মা হাসলেন- তোর কাছে তো সব ৫০০ টাকার নোট। রিক্সাওয়ালা ভাংতি দিতে পারবে না। এটা নে ।
আমার কিযে আনন্দ । আম্মা তোষক তুলেছেন। টাকা দিয়েছেন আমায়। আমি আম্মাকে বললাম- আপনি এখনো তোষকের নিচে টাকা রাখেন ? আম্মা তার গৌরবময় হৃদয়টা মেলে দিয়ে হাসলেন- বাবা, এইটাই আমার নিরাপদ ব্যাংক। আমার জীবনের বড় সার্থকতা কি জানো ? - আমার কোন সন্তান চোর নয়।
আম্মা নেই। তোষক আছে। কিন্তু তোষকের নিচে এখন আর কেউ টাকা রাখে না । আম্মা সম্পদ,খ্যাতি, আভিজাত্য কিছুই চাননি। চেয়েছিলেন, তোষকের টাকাটা যাতে ঠিক থাকে। এইটুকু-ই।
পৃথিবীর সকল মা-ই ভাল থেকো । আল্লাহ যেন তোমাদেরকে, আরামের তোষকে শান্তিময় ঘুম দেন। এইপাড়ে, ওই পাড়েও। আমিন।