সুযোগ পেলে মানুষ কেন বদলে যায়

 

সুযোগের অভাবে সৎ: মানুষের ভেতরের হিংস্রতা কি সত্যিই সুপ্ত থাকে?

আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়? আমরা কি আসলেই জন্মগতভাবে ভালো, নাকি সুযোগ পেলে আমাদের ভেতরের অন্ধকার দিকটা বেরিয়ে আসে? দুটি ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এমন কিছু সত্য তুলে ধরেছিল, যা সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।



পরীক্ষা ১: রিদম জিরো – যখন হিংস্রতার কোনো সীমা থাকে না

সাল ১৯৭৪। সার্বিয়ার এক তরুণী শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ নেপলসে একটি সাহসী পারফরম্যান্সের আয়োজন করেন, যার নাম ছিল ‘রিদম জিরো’। একটি ঘরের মধ্যে তিনি ৬ ঘন্টা ধরে পাথরের মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। সামনে একটি টেবিলে রাখা ছিল ৭২টি জিনিস – গোলাপ, লিপস্টিক, কেক থেকে শুরু করে ছুরি, কাঁচি আর এমনকি একটি লোড করা পিস্তলও। দর্শকদের বলা হলো, এই ৬ ঘন্টায় তারা মারিনার সাথে যা খুশি তাই করতে পারে।

শুরুর দিকে দর্শকরা বেশ নিরীহ ছিল। তারা মারিনাকে ফুল দিল, তার চুল আঁচড়ে দিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকল, মানুষের আসল রূপটা বেরিয়ে আসতে শুরু করল। আড়াই ঘন্টা পর তাদের আচরণে হিংস্রতা দেখা দিল। মারিনাকে থাপ্পড় মারা হলো, তার পোশাক ছিঁড়ে নগ্ন করে দেওয়া হলো। একজন ছুরি দিয়ে তার শরীরে আঘাত করল, আরেকজন তার হাতে পিস্তল তুলে দিয়ে ট্রিগার টানার চেষ্টা করল!

মারিনার প্রতি এই মানুষদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল না। তবুও তারা তাকে অপমান করল, আঘাত করল এবং প্রায় হত্যা করতে চেয়েছিল। পরীক্ষা শেষে যখন মারিনা হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে যারা অপমান করেছিল, তারা লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। এই পরীক্ষা প্রমাণ করে দিল, যখন কোনো সামাজিক বা নৈতিক বাধা থাকে না, তখন মানুষের ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

পরীক্ষা ২: স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট – ক্ষমতার নেশা কতটা ভয়ংকর?

১৯৭৩ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালানো হয়, যা স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট নামে পরিচিত। ১৪ জন স্বেচ্ছাসেবীকে টাকার বিনিময়ে এই পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয়। তাদের দুটি দলে ভাগ করা হলো – 'বন্দি' এবং 'কারাগারের গার্ড'। সবার কাছেই এটা ছিল একটি অভিনয়। শর্ত ছিল, গার্ডরা বন্দিদের ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন করতে পারবে না।

পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিন পরেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে। 'গার্ড'রা বুঝতে পারছিল যে তারা ক্ষমতার অধিকারী এবং সেই ক্ষমতা তারা নির্মমভাবে ব্যবহার করতে শুরু করল। তারা বন্দিদের জামাকাপড় খুলে নগ্ন করে রাখল, তাদের ঘুমাতে দিল না এবং অবর্ণনীয় মানসিক নির্যাতন শুরু করল। সময় বাড়ার সাথে সাথে নির্যাতন এতটাই বেড়ে যায় যে, গার্ডরা বন্দিদের হাত-পা বেঁধে রাখে, তাদের মুখের ওপর প্রস্রাব করে এবং এমনকি একজন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, ১৫ দিনের পরীক্ষা মাত্র ৬ দিনেই বন্ধ করে দিতে হয়।

এই পরীক্ষা দেখিয়েছিল যে, মানুষের মধ্যে যদি ক্ষমতা থাকে, তাহলে কোনো কারণ ছাড়াই তারা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। তারা জানত যে এটি কেবল একটি খেলা, তবুও ক্ষমতার মোহে তারা ভুলে গিয়েছিল মানবিকতা।

এই দুটি ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ভেতরের হিংস্রতা আর পাশবিকতা কোনো নির্দিষ্ট কারণের উপর নির্ভর করে না। বরং, যখনই সুযোগ আসে, তখনই তা বেরিয়ে আসতে পারে। আমরা যাকে ভালো মানুষ বলি, সে হয়তো কেবল 'সুযোগের অভাবে সৎ'। তাই হয়তো পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালো মানুষ হাতেগোনা দু-একজনই থাকে।


জীবন চলমান, তাই পরিবর্তন অপরিহার্য

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন