অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় পার করেও কি আমাদের প্রাণের মুক্তি মিলেছে


ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির মাস। বিশ্বের মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি রাষ্ট্রের জায়গা করে নেওয়ার মাস। লাল-সবুজের পতাকার মাস।

প্রাণপণ লড়াইয়ের মাস। বাঙালি জাতির গর্ব আর অহংকারের মাস। ডিসেম্বর বাঙালি জাতিসত্তার অনন্য চেতনার মাস। লাখো শহিদের স্মৃতিবিজড়িত মাস। স্বাধীনতাকামী সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় সংকল্পে ত্রিশ লাখ শহিদ আর অজস্র মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা আর আমরা খুঁজে পেয়েছি গৌরব আর অহংকারের বিজয় দিবস।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু স্বাধীনতার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল সামগ্রিক মুক্তির জন্য। তাই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তির সংগ্রাম নামেও অভিহিত করা হয়। ‘মুক্তি’ শব্দটি এখানে ব্যাপক অর্থবোধক ও গভীর তাৎপর্যবহ। স্বাধীনতা সহজে অনুমেয়। পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমরা নিজস্ব একটি মাতৃভূমি, নিজেদের করে একটি পতাকা পেয়েছি; কিন্তু যে সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের লাখো শহিদ আর অগণিত মা-বোন তাদের সর্বস্ব ত্যাগ করেছে, সেই ‘মুক্তি’ কি আমরা পেয়েছি? বিজয়ের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের বয়স এখন অর্ধশত বছরের বেশি; কিন্তু প্রাণের এদেশ কি তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে? বিজয়ের মাস এলেই শুধু আমাদের মাঝে দেশপ্রেম উপচে পড়ে। ডিসেম্বর এলে প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া, লেখক, কবি, শিল্পী, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী, রাজনীতিক কিংবা তথাকথিত দেশপ্রেমিকরা মাতৃভূমির প্রেমে যেন উদ্বেল হয়ে ওঠে! এই একটি দিনের জন্যই যেন সব দেশ্রপ্রেম! ১৬ ডিসেম্বর লাল-সবুজের টি-শার্ট, পাঞ্জাবি কিংবা শাড়ি পরে স্মৃতি সৌধে ফুল দেওয়া, মিছিল করা, বিশেষ নাটক বা পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ থাকে বিজয়ের গৌরবগাথা আর ত্যাগের ইতিহাস। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একই আবেগ আর শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। নানা ঋতুতে যেমন আমরা বিভিন্ন পিঠা-পায়েস কিংবা ফল-ফুলের কথা মনে করি, তেমনি ডিসেম্বর এলেই আমরা বিজয়ের কথা ভাবি। এ একটি দিন পার হয়ে গেলে আমাদের চেতনার সব দ্বার বন্ধ করে ফিরে যাই পুরোনো চরিত্রে।

বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া যেন দেশের প্রতি আমাদের আর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই! অথচ লাখো শহিদের রক্তস্নাত এ বিজয় আজও সাধারণ মানুষের কাছে পরিপূর্ণ বিজয় হিসাবে ধরা দেয়নি। পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত হলেও প্রাণের মুক্তি মিলেছে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ! দেশ এগিয়েছে অনেক। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রচেষ্টা চলছে, উন্নয়নের গতিধারাও চলমান; কিন্তু মানুষের সব মৌলিক অধিকার এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এখনো চলছে দুর্নীতির লাগামহীন প্রতিযোগিতা, পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য, নারী ও শিশু নির্যাতন। চলছে নৈতিকতা আর সততার চরম দুর্ভিক্ষ। গণতন্ত্র এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

সর্বজনীন ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত আজও গড়ে ওঠেনি। বিজয়ের অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় পার করেও দাঁড় করাতে পারিনি একটি উপযুক্ত, আধুনিক ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা। মৌলিক অধিকারের অন্যতম ‘স্বাস্থ্যসেবা’ থেকেও দেশের বিরাট একটি অংশ বঞ্চিত। সর্বসাধারণের জন্য এখনো কোনো জুতসই স্বাস্থ্যনীতি ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের সব মানুষের জন্য একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা সময়ের দাবি, অথচ সেদিকে কারও তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, খাদ্যে ভেজাল, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল, বেকারত্বের অভিশাপে দিশেহারা আমাদের তরুণ প্রজন্ম। এগুলোর প্রতিকার করতে না পারলে বিজয় দিবস উদ্যাপন শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে নতুন প্রজন্মের কাছে।

বিজয় দিবসকে শুধু একটি উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী কীভাবে বিজয়ের আমেজ আমাদের জীবনে থাকে, সেই দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করা এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। বিজয়ের রেশ যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে থাকে। সারা বছর যেন আমরা স্মরণ করি দেশমাতৃকার জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন, সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে যেন সমুন্নত রাখতে পারি, সেই প্রচেষ্টা থাকতে হবে সবার মনে। সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেকে যেন দেশ-জাতির কল্যাণের কথা ভেবে দেশের উন্নয়নে মেধা-মনন ঢেলে দিই। ভেদাভেদ, প্রতিহিংসা আর ক্ষমতা দখলের অগণতান্ত্রিক মনোবৈকল্য বাদ দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারলেই বিজয়ের এ আনন্দ-উল্লাস সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে।




 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন