মদীনার বাজারে অনেক দামি মিষ্টি আসলো। এগুলো ছিলো বিদেশি মিষ্টি। কিন্তু, মিষ্টির এতো দাম, কেউ কিনতে পারছে না।
ধরেন বর্তমান বাজারে মিষ্টির কেজি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা। সেই হিশাবে ঐ মিষ্টির কেজি ছিলো ৫ হাজার টাকা!
লোকজন মিষ্টি বিক্রেতাকে বললো, "তোমার মিষ্টির যা দাম, এই দামে বাজারের কেউ কিনতে পারবে বলে মনে হয় না। তুমি বরং আব্দুল্লাহ ইবনে জাফরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছে যাও।"
মিষ্টি বিক্রেতা আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে মিষ্টি নিয়ে গেলো। তিনি দাম শুনলেন। তারপর বললেন, "যতো মিষ্টি নিয়ে এসেছো সব আমার কাছে বিক্রি করো।"
লোকটি তার সব মিষ্টি বিক্রি করে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছিলো।
তখন দেখলো আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর বাজারে গিয়ে লোকজনকে বললেন, "আসুন। আপনারা এই মিষ্টি কিনতে পারেননি। আপনারা না এই 'বিদেশি মিষ্টি' খেতে চেয়েছিলেন? নিন, সবাই ভাগ করে খেয়ে নিন।"
মিষ্টি বিক্রেতা বেশ অবাক হলো। এতো দামি মিষ্টি একজন কিনলেন, আবার সবাইকে বিতরণও করছেন!
সে মিষ্টি বিক্রেতা হয়েও এই দামি মিষ্টি কখনো খেতে পারেনি।
সে বললো, "আমি কি ওখান থেকে মিষ্টি খেতে পারি?"
আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর বললেন, "হ্যাঁ, খাও না, অসুবিধে নেই।"
আরেকটা ঘটনা বলি,
"একসময় আমি ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতাম। অথচ আজ আমার সাদকার পরিমাণ ৪০০০ দিনার!"
যেই সাহাবী ক্ষুধার তাড়নায় একসময় পেটে পাথর বাঁধতেন, সেই সাহাবী জীবনের আরেক পর্যায়ে এতোটা অবস্থাসম্পন্ন হন যে, তিনি আমাদের সময়ের হিশেবে প্রায় ৪ কোটি টাকার মতো দান করতেন!
তাঁর নাম আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। বিয়ের সময় মোহরানা দেবার মতো যার কিছু ছিলো না। শেষ পর্যন্ত তাঁর বর্মটি বিক্রি করে মোহরানা দেন।
সাহাবীরা গরীব ছিলেন বলে যে ন্যারেটিভ প্রচলিত, সেটা খুব একটা সত্য না।
ছবির ছকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ৪ জন সাহাবির সম্পদের পরিমাণ দেয়া হয়েছে। সাহাবিগণ কতোটা সম্পদশালী ছিলেন সেটা আমাদের অনেকের চিন্তার বাইরে।
বুঝার সুবিধার্থে যদি কেউ ক্যালকুলেশন করতে চান, তাহলে দুটো ফর্মুলা ফলো করতে পারেন।
১. Gold Standard:
তখনকার যুগের ১ দিনার = ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। সেই হিশেবে ১ গ্রাম বর্তমানে বাংলাদেশে ১ গ্রাম (২০ ক্যারেট) স্বর্ণের দাম প্রায় ৮০০০ টাকা।
তাহলে সেই যুগের ১ দিনার = ৮০০০*৪.২৫। হিশাব করে বের করতে পারেন।
সেই যুগে ১ দিনার = ১০ দিরহাম। তাহলে একসাথে দিনার-দিরহামের হিসাব করতে পারেন।
২. Purchasing Power of Money:
সেই যুগে ১ দিনার (বা ১০ দিরহাম) দিয়ে একটি ভেড়া কেনা যেতো। বর্তমানে একটি ভেড়ার দাম কতো? ৮,০০০/১০,০০০ টাকা?
এভাবেও হিশাব করতে পারেন।
আরেকটা ঘটনা বলি,
একবার আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি জমি বিক্রি করবেন। অনেক দামি জমি, যে কেউ এই জমি কিনতে পারবে না।
জমিটি কেনার জন্য এগিয়ে আসেন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু; আরেকজন ধনী সাহাবি। ৪০,০০০ দিনারে তিনি জমিটি কিনেন। প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু জমি বিক্রির ৪০ হাজার দিনার পেয়ে সেগুলোকে তিনভাগে ভাগ করলেন।
একভাগ দিলেন তার নিকটাত্মীয়কে।
একভাগ দিলেন মদিনার দরিদ্রদেরকে।
একভাগ দিলেন উম্মুল মুমিনীনদের।
আমাদের সময় একজন ব্যক্তি ৪০-৫০ লক্ষ বা ১ কোটি টাকা দিয়ে একটা জমি বিক্রি করে সেটা দিয়ে পুনরায় জমি কিনে বা বিনিয়োগ করে।
আর একজন সাহাবি জমি বিক্রির বিশাল এমাউন্ট পুরোটাই মানুষকে দিয়ে দেন!
এটা তখনই সম্ভব হয়েছিলো, যখন তারা সম্পদকে হৃদয়ে জায়গা না দিয়ে হাতে জায়গা দিয়েছিলেন। সম্পদ হাতে থাকলে মানুষকে দান করা যায়, হৃদয়ে জায়গা করে নিলে সেটা সম্ভব না। যেসব সাহাবি কোটিপতি ছিলেন, তাদের প্রত্যেকেরই এই বৈশিষ্ট্য ছিলো। সম্পদ ছিলো তাদের হাতে, হৃদয়ে না।
সুবাইহা আত-তাইমী ছিলেন ঋণগ্রস্ত। মানুষজন তাঁর কাছে ৩,০০০ দিরহাম পেতো। সেই যুগে ৩০০০ দিরহাম দিয়ে একটা পরিবারের একবছর চলতে পারতো।
তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু শুনতে পেলেন সুবাইহা আত-তাইমীর কথা। ঋণের চিন্তা থেকে দ্বীনি ভাইকে মুক্ত করতে তিনি উদ্যোগ নেন।
নিজেই সেই ঋণ পরিশোধ করে সুবাইহা আত-তাইমী কে ঋণ মুক্ত করেন।
ধনী সাহাবিরা তাঁদের সম্পদ দিয়ে কী পরিমাণ মানুষের উপকার করতেন সেটা আমাদের চিন্তার বাইরে। তারা নানামুখী কাজে মানুষকে সহযোগিতা করতেন।
'কোটিপতি সাহাবি' বইয়ে সেসব ঘটনাগুলোর উল্লেখ আছে।